Saturday, March 14, 2020

"সেই তুমি " পর্বঃ ৬



জলের বাসায় সেদিন সন্ধ্যায় ঃ 

জলের মা হেনা বেগম তরকারি কুটছিলেন এমন সময় জল রুমে ঢুকলো। ঢুকেই সোজা ভিতরের রুমে দরজা লাগিয়ে দিলো। হেনা বেগম খুব রাগী স্বভাবের। মাগরিবের সময় একে বাইরে থেকে এসেছে তার উপর হাত মুখ না ধুয়ে রুমের দরজা লাগানো তে হেনা বেগম রেগে দরজায় গিয়ে খুব জোড়ে জোড়ে আঘাত করতে লাগলেন!  

হেনা বেগমঃ কিরে তুই পড়তে যাস,  নাকি ঘুরতে যাস, যে এতোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিস! দরজা খুলে হাত মুখ ধুয়ে বাবুনি কে কোলে নিয়ে পিটার খাওয়া। তাড়াতাড়ি কর, না হলে আজ বুঝবি.......
কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে হেনা বেগম রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো কিন্তু জল দরজা খুললো না। ওর কেন জানি কান্না পাচ্ছিল। মন সায় দিচ্ছিল না, তবু কেন ও অন্তু কে এতো অপমান করল বুঝে উঠতে পারছেনা! সে বোরকা খুলে ফ্যানের রেগুলেটর টা ফুল বাড়িয়ে দিল। তবু শরির আর গাল ভিজে যাচ্ছে ঘামে.....

অস্থির লাগছে সব কিছু! মনে মনে বারবার কেন অন্তুর নাম আসছে! আমি ত ওর সাথে প্রেম করিনি! আমি শুধু মজা করেছি আর আমার অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি! তবে কেন বারবার ওর মুখ ওর হাসি ভেসে উঠছে মনের ভেতরে!  
জল ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত বারবার পায়চারী করতে লাগলো....... দাঁত দিয়ে নখ কাটা ওর স্বভাব, যখন বেশি চিন্তায় পড়ে যায় তখন জল এমনটা করে। তাই এখনো না চাইতেও আংগুল টা মুখের ভিতর ই র‍য়ে গেছে....


****অন্তু বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো কিন্তু অস্থিরতা কমাতে পারলো না। সে হাত জোড় করে মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলো - আল্লাহ তুমি জলকে প্লিজ আমার কাছে ফিরিয়ে দাও! আমি ওকে আর কখনো কষ্ট দিবো না, ওকে ভুলেও আর স্পর্শ করবো না, তুমি ওকে প্লিজ ফিরিয়ে দাও! কথাগুলো বলতে বলতে কন্ঠ ভারী হয়ে উঠল কান্নায়। এমন সময় তানহা ঘরে ঢুকলো।  

তানহা বাতি জ্বালিয়ে বললঃ দাদা,এই মাগরিবের সময় তুমি বাতি অফ করে কি করতাছ?অন্তুকে ছোটবেলা থেকেই তানহা দাদা ডাকে, ভাইয়া ডাকতে ওর খারাপ লাগে।  অন্তু খেয়াল করে নি তানহা কখন এসেছে তাই চোখের কোণের পানি মুছতে পারেনি, তানহা ব্যাপার টা লক্ষ্য করে বললঃ তুমি কান্না করতাছ কার জন্যে শুনি? ওই মোটি তোমাকে কি বলে অপমান করছে? আমাকে বলো, আমি ওর বারোটা বাজিয়ে দিয়ে আসি! 
অন্তু তাড়াহুড়ো করে চোখের পানি মুছে বললঃ বেশি বুঝবি না, ও কিছু বলে নি, কিন্তু কেন জানি আজকে কান্না পাচ্ছে! তানহা বুঝেও না বুঝার ভান করে বললঃ কিছু না বললেই ভালো, তা না হলে আমি আবার ভাইলেন হয়ে গেলে মোটির সাইলেন হতে সময় লাগবে, কথাটা বলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, অর্ধেক বের হবার পর আবার আসলো,  মুখে একটা হাসি নিয়ে বললঃ দাদা, প্রেম করিস না, কষ্ট সহ্য করতে পারবিনা! অন্তু একটু চোখ বড় বড় করে তাকাতে ই তানহা টিভির রুমে চলে গেলো।  তানহা,চলে যাবার পর অন্তুর ভেতর টা আরো খালি খালি লাগছিল! ও নিজেকে নিজে বুঝাতে ই পারছে না, মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে যে ওর সাথে কেউ এমন টা করতে পারে।



*** হেনা বেগম ঘরে দরজা লাগানো দেখেই বুঝলেন ছোট মেয়েকে এখনো পিটার খাওয়ানো হয়নি জলের। তাই হাতে মাঝারি সাইজের একটা বেত এক হাতে নিয়ে অন্য হাত দিয়ে দরজায় গিয়ে খুব জোড়ে থাপ্পড় দিতে লাগলো ঃ 

জল!! তুই ভেতরে কি করছিস শুনি? দরজা খোল যদি ভালো চাস! 

মায়ের কন্ঠ শুনে জিদ টা আরো বেড়ে গেলো ওর। সে দরজাটা জোড়েই খুলল। 
জলঃ কি সমস্যা তোমার? একটু বিশ্রাম ও নিতে পারবো না তোমার জন্যে?

হেনা বেগম জলের কথার কোন জবাব না দিয়ে সোজা গিয়ে ওর স্কুল ব্যাগ টা খুলে সব চেক কর‍তে লাগলো।  জল অবাক হয়ে ভ্রু- কুচকে মায়ের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল, কিছু একটা বলতে যাচ্চিল কিন্তু মায়ের হাতের বেতের দিকে তাকিয়ে মুখে আর কিছু বলার সাহস হলো না। 

মা বই চেক করছে হঠাৎ বাহিরের দরজায় কে যেনো নক করল। জল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সন্ধ্যা ৭. ৩০ বাজে! তারমানে বাবা আসছে। সে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। বকুম হোসেন হাতের বাজারের ব্যাগ টা জলের হাতে দিয়ে বললঃ তোর মা কোথায়? জল নিচের ঠোঁট উপরের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে বললঃ তোমার বৌ আমার পিছে লাগছে কেন? গোয়েন্দা সংস্থায় ভর্তি করে দাও নিয়ে! আমার স্কুল ব্যাগে কি আছে যে এতো চেক করা লাগবে? 

বকুল হোসেন হেসে বললঃ কই গেলা তুমি? মেয়ে বড় হচ্ছে, ব্যাগে ত কত কিছুই থাকতে পারে, কেন না বলে খুল তুমি? 
হেনা বেগম চোখ গরম করে বললঃ বড় হচ্ছে দেখেই চেক করি। এটা বলে উনি জলের হাত থেকে বাজারের ব্যাগ টা টান দিয়ে নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো।




"সেই তুমি" পর্বঃ ৫



জলের সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে প্রতিটি দিন অন্তুর কাছে স্বপ্নের মতো লাগছিল....জল সাধারণত সবার আগেই আসে ওর বাসায়, আজো অনেকটা আগেই চলে এসেছে।  অন্তু এই কয়েক দিনে জল কে একবার ও ভালো করে দেখেনি তাই আজ জল আসতেই সে তাকে সামনে বসিয়ে রেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এভাবে তাকানো তে জল অনেকটা বিব্রতবোধ করল। কিন্তু অন্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখতে লাগল। কি সুন্দর চোখ, ঠোঁট দুটি গোলাপি, জলের গঠনটা অন্য সব মেয়েদের থেকে অন্তুর কাছে একেবারেই ব্যতিক্রম মনে হলো। জল অনেক মোটা কিন্তু অন্তুর চোখে নাকি সেটাই জল কে আরো অতুলনীয় করে তুলেছে।

জলঃ কি দেখছেন এমন করে?

অন্তুঃ দেখছে, আমার স্বপ্নটা কে!! স্রষ্টার সকল সৃষ্টির মাঝে যে তুমি এক অন্য উপমা!
 
জলঃ আমি ত তেমন সুন্দর নই, যতোটা আপনি ভাবেন। কথা বলে জল উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের কাজল টা ঠিক আছে কি না দেখতে লাগল। অন্তু ওকে পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরতেই জল হঠাৎ করেই রেগে উঠল...........

জলঃ আমি এটা আশা করিনি আপনার কাছে! আমার অনুমতি ছাড়া আপনি গায়ে টাচ করলে কেন? কি ভাবেন আমাকে?  

অন্তু বুঝতে পারলো না জল এতো ছোট্ট একটা ব্যাপারকে এতো বড় করে দেখছে কেন? অন্তু কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল! অন্য ছাত্র-ছাত্রী রা এসে পড়েছে!

অন্যরা রুমে ঢুকেই জলের গম্ভীর মুখ দেখে কিছুটা অনুমান করতে পেরেছে যে কিছু একটা হয়েছে কিন্তু সেটা কি তা কেউ ধরতে পারল না। অন্তু অনেক চেষ্টা করল সবাইকে মনোযোগ দিয়ে পড়ানোর, কিন্তু কিছুতেই আজ ওর মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। ওর চোখ বারবার জলের দিকে আটকে যাচ্ছিল। জল একদম গম্ভীর হয়ে গেছে। অন্তু মনে মনে নিজেকে অনেক গালি দিতে লাগলো...... 
 কেন এমন করল সে! আজকে জল কে সরি বলতে হবে। এটা ভেবে জলকে কিছু একটা বলতে যাবে, এমন সময় জান্নাত বললঃ স্যার, আপনার কি মন খারাপ?  সেই কখন থেকে এতো জোড়ে জোড়ে ডাকছি আপনি শুনতেই পাচ্ছেন না! 
জান্নাতের কথায় অন্তুর হুশ ফিরল! তাইতো! ও কোন জগতে হারিয়ে গেছে যে অন্যদের এতো বার ডাক ও ওর কাছে পৌঁছাতে পারেনি! মুখে একটা কৃত্রিম হাসি আনার চেষ্টা করল কিন্তু হাসি আসলো না, জলের চেহারা দেখে মাঝ পথেই হাসি ফিরে গেছে! 

অন্তু জান্নাতের দিকে ফিরে বললো ঃ কিছু হয়নি, মাথা ব্যথা করছিল তাই খেয়াল করিনি! 
কথাটা যে একেবারেই মিথ্যা তা ধরতে অন্যদের তেমন সময় লাগলো না। কিন্তু এবার অন্য কেউ কিছু বলার আগে জল বললঃ স্যার, সবার সামনে আমি গত সপ্তাহে আপনাকে propose করেছিলাম কিন্তু আপনি আমাকে সবার সামনেই অপমান করেছিলেন। কথাটা সবার সামনেই বলি- আমি এতোদিন আপনার সাথে প্রেমের অভিনয় করেছিলাম! আসলে, ভালো বাসা জিনিসটা আমার জন্য নয়, আমি ভালোবাসাতে বিশ্বাস করিনা। সবাই আমাকে আপনাকে প্রস্তাব দেওয়ার জন্যে অনেক বাজে কথা শুনিয়েছিল, তখন ই ভেবে নিয়েছিলাম আপনার অপমান টা আপনাকে ফিরিয়ে দিবো! I am sorry....... আমি এতোদিন শুধু আপনার সাথে অভিনয় করেছি, মাফ করে দিবেন। কথাটা বলে জল ব্যাগ নিয়ে চলে গেল রুম থেকে.....

জলের এই রকম কথায় অন্তুর পাশাপাশি সব মেয়েরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো একে অন্যের দিকে! নন্দিনি মাথা নিচু করে নখ কামড়াতে লাগলো, জান্নাত "থ" হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে জলের চলে চাওয়া দেখছিল, আহমেদ আর সাজু টেবিলের উপর একটা থাপ্পড় দিয়ে বললঃ 
স্যার, এটা কি! জল ত কাউকে কোন পরোয়া ই করতাছে না! ওর যখন যা মন চায় তা ই করতাছে! আপনে বলে ওরে ঘর থেকে ধরে নিয়ে আসি! 

অন্তুর ওদের কথার দিকে কোন খেয়াল নেই। ওর মনে হচ্ছে ওর পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে! পা দুটি কাঁপছে! কিছুতেই মন কে বোঝাতে পারছে না যে এতোদিন জল অভিনয় করেছে! পরিচয় টা অল্প দিনের হলেও অন্তু জল কে অনেক বেশি ভালো বেসে ফেলেছে,ওর মনে হচ্ছিল জল রাগের জন্যে এসব বলেছে, কালকে হয়তো ঠিক ই ফিরে এসে সরি বলবে।তাই নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে 
অস্পষ্ট স্বরে বললঃ আজ তোমাদের ছুটি। 

***সবাই চলে যাওয়ার পর অন্তু বারান্দায় ফুল গাছের পাশে দাঁড়িয়ে বার বার আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলো, জল যেনো কাল ফিরে আসে! মনে মনে বললঃ এইবার ও ফিরে আসলে আমি আর ওকে কখনো স্পর্শ করবো না......




Friday, March 13, 2020

"সেই তুমি " পর্বঃ ৪



জল চলে যাবার পর থেকেই অন্তুর মনটা অনেক ছটফট করছিল। সে যতোই চেষ্টা করছে মন কে শান্ত রাখার, পারছেনা। ওর বার বার এটাই মনে হচ্ছিল- এতো টা অপমান না করলেও হতো মেয়েটাকে। অন্তু ঢাকায় একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটি তে মাস্টার্স পড়ছে, বাবা- মা অনেক আগেই মারা গেছে, গ্রামে থাকে পুরো পরিবার,  পড়াশোনার জন্য অন্তু ঢাকায় থাকে, রান্নার জন্য ওর ছোট বোন তানহা থাকে সাথে। সে একবার ভাবলো, তানহাকে সব বলবে, আবার ভাবলো- না থাক, আপাতত কাউকেই কিছু বলবেনা.......কালকে জল আসলে ওকে বুঝিয়ে শান্ত করলেই অন্তুর মনের অবস্থা হয়তো পাল্টে যাবে। এসব সাত পাচ ভাবতে ভাবতে সে ঘরের বাতি অফ করে শুয়ে রইলল সে সচরাচর এতো আগে টিভির রুম থেকে উঠে না কিন্তু কেন জানি আজকে ওর টিভির প্রতি মন নেই, ছোট বোন তানহা একবার ডাকলেও অন্তু সাড়া না দিয়ে খাটে উপুর হয়ে শুয়ে রইল। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়ল টেরই পেলো না। হঠাৎ ঘুম ভাংল একটা স্পর্শ তে! প্রথমে বুঝতে পারেনি কে........চোখ কচলে একটু ভালো করে তাকাতেই দেখলো-জল সামনে দাঁড়িয়ে আছে!!! হঠাৎ সারপ্রাইজ বলতে যা বোঝায়, অন্তুর বেলায় ও তাই হলো......সে ভেবচা খেয়ে গেলো!

জল অন্তুর দিকে তাকিয়ে আছে আর দাঁত দিয়ে হাতের নখ কাটছে............মুখে কোন কথা নেই..............অন্তু ই প্রথমে নিরবতা ভেংগে প্রশ্ন করলোঃসব ছাত্রীদেরকে অন্তু সাধারণত 'আপনি' করেই ডাকে, জল কে ও আপনি করেই ডাকতে গিয়েও সামলে নিয়ে বললঃ

অন্তুঃ এই অসময়ে তুমি এখানে! 

জল গলা পরিস্কার করার জন্য একটা ছোট্ট কাশি দিয়ে বললঃ 
কেন, আসতে বারন আছে নাকি? না দেওয়ালে সাইনবোর্ড লাগানো আছে যে, পড়ার সময় ছাড়া আপনার বাসায় আসা যাবে না?
 
বাকা কথাটা অন্তুর তেমন সহ্য হয় না, এখনো হলো না। সে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলোঃ সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হইছ, তারমানে অন্য কোথাও যাচ্ছ আমার বাসার নাম করে? এসব কি?

জল আগেই বুঝতে পেরেছিল অন্তু ওর আসাটা তে যতোটা না অবাক হয়েছে তারচেয়ে বেশি সন্দেহ করেছে তাই ওর কথা শুনে হেসে বললঃ পাগল নাকি আপনি! আমি আপনার কাছেই আসছি! বাসায় যাওয়ার পর থেকে অনেক ভেবেছি, হয়ত আপনার কথাই ঠিক, আমার কোন যোগ্যতা নেই আপনার সাথে সম্পর্ক করার! হয়তোবা আমি ই একটু বেশি আশা করে ফেলেছিলাম,  বুঝিনি আপনি ত আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে! 
কথাগুলো বলতে বলতে জলের চোখ ভিজে উঠল, এই রুমের বাতি অফ ছিল কিন্তু পাশের রুমের আলোতে অন্তু স্পষ্ট দেখতে পেলো জলের চোখের কোনে পানি জমে আছে........সে মনে মনে দোয়া করতে লাগলো....... আল্লাহ ওর মন যেনো ঘুরে না যায়, আমিও ওকে ভালোবেসে ফেলেছি!! কিন্তু মনে ঝড় উঠলেও মুখে তা গোপন করার চিরাচরিত একটা স্বভাব অন্তুর ছেলেবেলা থেকেই আছে,তাই এখনো সেই কাজটা ই করল। মুখের ভাবে কোন পরিবর্তন আনলো না, সে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল.......

জলঃ আমি আপনাকে ভুলে যাবো সিন্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলাম! কিন্তু বিশ্বাস করেন, এখান থেকে বাসায় যাওয়ার পর থেকে আমি একটা সেকেন্ডের জন্য ও আপনার চেহারাটা ভুলতে পারছিলাম না! আমার ভেতর টা আপনার জন্য জ্বলে যাচ্ছে! কথাগুলো বলতে বলতে জলের গলা ভারি হয়ে উঠল কান্নায়............
কিছুটা নিশ্বাস নিয়ে জল আবারও বলতে লাগলোঃ
 ভালোবাসা কি তা আমি জানি না তবে আপনাকে দেখার পর কেন জানি খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে.......হয়তো আমি আপনাকে অল্প কয়েক দিন ধরে চিনি কিন্তু এই অল্প কয়েকটি দিন ই আমি বুঝতে পেরেছি হয়তোবা আপনি ই আমার জন্য পারফেক্ট......... 

অন্তু কি বলবে ভেবে পেলো না! একটা মেয়ে যার বয়স মাত্র ১৬/১৭ হবে, সেই মেয়ের মুখ দিয়ে এমন কথা বের হবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। এটা মুভির মতো লাগছে ওর কাছে তাই একগাল হেসে বললঃ 
কতোদিন ধরে এই ডায়লগ মুখস্ত করেছ? 

জলঃ আপনার যা ইচ্ছা ভাবতে পারেন, আমি কোন মুভি দেখিনা, আর এসব সবগুলোই সত্যি কথা।

অন্তু হেসে বললঃ হুম বুঝলাম। আমার সাথে প্রেম করতে হলে তোমাকে ৩ টা শর্ত মানতে হবে। পারবা মানতে? 

জল মনে মনে অনেক খুশি হলো কিন্তু মুখে প্রকাশ করলো না, বলল-- চেষ্টা করবো।আপনি বলেন শুনি কি কি শর্ত আপনার?

অন্তু এবার জল কে হাতে ধরে খাটে বসালো,  জলের হাত দুটি নিজের হাতে নিয়ে বললঃ তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে আমি তোমাকে ই ভাবছিলাম,  সত্যি তোমাকে হয়তোবা ভালোবেসে ফেলেছি!  

অন্তুর কথা মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে জল বললঃ বাসায় আম্মু কে বলে আসছি নন্দিনির কাছে বই নিতে আসছি, তাই এসব কালকে শুনবো, আপনি শুধু এটা বলেন এখন শর্ত ৩ টা কি কি?

অন্তু ঃ আচ্ছা তাহলে আমার প্রথম শর্ত হচ্ছে তুমি ঘর থেকে কোথাও বের হতে পারবে না, আমার পারমিশন ছাড়া, যদি মা নিয়ে যায় কোথাও যেতে পারবা, এ ছাড়া অন্য কারো সাথে কোথাও যেতে পারবে না। 
২য় শর্ত হচ্ছে - তুমি কোন ছেলেদের সাথে কথা বলতে পারবে না, কোন জায়গায়, স্কুলেও না। আর ৩য় টা হচ্ছে, যদি কখনও কোথাও যেতে হয় বোরকা পরে, হিজাব পরে যেতে হবে। পারবা মানতে?

জল খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলি শুনছিল, অন্তুর কথা শেষ হতেই বললঃ যদিও শর্তগুলো অনেক কঠিন আর অঅদ্ভুত তবু আমি আপনার জন্য সবগুলি ই মানবো কারন আপনি আমার জন্য আমার পৃথিবী। কথাটা বলে জল চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল, অন্তু বললঃ 
আই লাভ ইউ!! 
জলঃ I love you too......কথাটা বলেই সাথে সাথে বের হয়ে গেলো। 


অন্তুর মনে হলো এতোক্ষনে হয়তো ওর প্রাণ টা সে ফিরে পেয়েছে কারন জল কে ছাড়া থাকা এখন যে ওর জন্যেও অসম্ভব!!! 

"সেই তুমি " পর্ব -৩



অন্যদিনের মতো ই অন্তু সবাইকে পড়াচ্ছিল। জল অন্তুর দিকে একটা খাতা বাড়িয়ে দিতে বললঃ স্যার,  একটু দেখেন তো, অংকটা হয়েছে কিনা?

অন্তু জলের হাত থেকে খাতাটা নিয়ে হা হয়ে গেলো! 
 সারা খাতাতে  I love you লিখা ছাড়া আর কিছু লিখা নেই! অন্তু রাগে ফেটে পড়ল, কিছু একটা  বলতে যাবে, জলের দিকে তাকাতেই জল ওকে চোখ টিপ দিলো! 

অন্তু মনে মনে ভাবল ঃ এই মেয়ে নিশচিত মাথায় problem আছে, তা না হলে এতো মানুষের সামনে কেউ এমন করে নাকি! কিন্তু কেন জানি আজকে মুখে কিছু বলতে পারল না, কারন মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ওর মন কেমন জানি শান্ত হয়ে গেল, খেয়াল করল রাগটাও আগের মতো নেই জলের উপর! তাহলে কি ও জল কে ভালো বাসতে শুরু করেছে!

না নিজের মন কে নিজেই শান্ত করল।এটা কি করে হয়........ও ত আমার ছাত্রী,  ওর সাথে এসব আমায় মানায় না। অন্তু ভাবলো আজকেই ঘটনা টা শেষ করতে হবে। তাই আজকে অনেকটা আগেই সবাই কে ছুটি দিয়ে দিলো। শুধু নন্দিনি, জান্নাত আর জল কে বলল থাকতে। 

অন্তুর কথাতে জলের ভিতর ভয় কাজ করতে লাগলো......... জল মনে মনে ভাবছেঃ হয়ত আজকে ওর খবর আছে, আবার ভাবলো, কিসের ভয়, যদি কিছু বলে এক ঘুসি দিয়ে পালিয়ে যাবও!
জল সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে খেয়াল ই করেনি কখন সবাই চলে গেছে, আর রুমে শুধু অন্তু আর জল ই দাড়িঁয়ে আছে! 
এবার সত্যিই জলের ভয় করতে লাগল! ভয়টা অন্তু কিছু বলবে এটার নয়, ভয়টা হচ্ছে জীবনের প্রথম কোন ছেলের সামনে একা দাড়িয়েছে, যদি কিছু করে বসে! যা!  কি সব ভাবছি আমি! হঠাৎ ই যেনো নিজেকে নিজে প্রস্তুত করল অপেক্ষাকৃত অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনার জন্য! জলের মনোভাব বুঝতে অসুবিধা হলো না অন্তুর। তাই অনেকটা ই স্বাভাবিক কন্ঠ করার চেষ্টা করে বলতে লাগলো ঃ দেখো, আমি কোন ভনিতা করতে চাই না, আমি মাস্টার্স এ পড়ি, আর তুমি পড় মাত্র ১০ম শ্রেণীতে, তোমার আমার মাঝে বিশাল ব্যবধান, আর তারচেয়ে বড় কথা হলো, তুমি আমার ছাত্রী,  সমাজের চোখে এটা একদম ই বেমানান! আমি তোমার সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারবোনা, আশা করি তুমি আমার কথা বুঝতে পেরেছ?

অন্তু কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে গেলো,  সে একবার ও কথাগুলো বলার সময় জলের চেহারার দিকে তাকায় নি, তাকালে হয়ত দেখতে পেতো ওর দুচোখ দিয়ে পানি পড়ে গাল ভিজে গেছে..........জল অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল কিন্তু পারছেনা, বুক টা কেন জানি কান্নায় ফেটে পড়তে চাইছে! তাই মুখে কিছু না বলে বই গুছাতে লাগলো,  ভেতর রুমে নন্দিনি, জান্নাত বসে ছিল। অন্তু যখন ভিতরে ঢুকলো  নন্দিনি বললঃ 
স্যার, আপনি কাজটা ঠিক করেন নি, জল আপনাকে অনেক ভালোবাসে! ও আপনাকে প্রথম দেখেই বলেছিল আপনার সাথে প্রেম করবে.........আপনার কথাগুলো আমরা শুনেছি, হয়তোবা আপনি জলের চেয়ে অনেক ভালো মেয়ে পাবেন কিন্তু ওর মতো এতো ভালো আর পবিত্র কাউকে পাবেন না। অন্তু কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু জল কান্নাভেজা কন্ঠে বললঃ এই তোরা বাসায় যাবি? আমি গেলাম.......বলেই দরজাটা খুব জোড়ে ধাক্কা দিলো! জান্নাত বললঃ এক মিনিট দাড়াঁ!  আমার একটা কথা আছে স্যারের সাথে...........জল দাড়ালো না, সে দরজাটা খুব জোড়ে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেলো, দরজার ধাক্কার শব্দটা এতোটাই প্রকট হলো যে, পাশের রুমের দরজা খুলে এক প্রতিবেশি চোখ দুটি বড় বড় করে তাকিয়ে রইল!

জান্নাত বললঃ স্যার, ও এমন ই, অনেক রাগি কিন্তু মনের দিক দিয়ে অনেক ভালো!  ও আপনাকে হয়তোবা অল্প কিছু দিন ধরে চিনে কিন্তু এই অল্প কয়েক দিনেই দিন রাত শুধু আপনার কথাই বলে, আমাদের সাথে ওর পরিচয় ৫ বছর ধরে, আপনি বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, এই ৫ বছরে যে কখনো কোন ছেলের নাম মুখে আনেনি, আর সেই মেয়ে নিজে আপনাকে প্রস্তাব দিয়েছে, দয়া করে একটু ভাববেন..........এটা বলে দু জন বেরিয়ে গেলো। অন্তুর মনে হচ্ছিল কোন মুভির দৃশ্য দেখছিল এতোক্ষণ!  সে নিজের অবাক হয়ে তাকিয়েই রইল ওদের যাওয়ার পথে...............

Thursday, March 12, 2020

"সেই তুমি"


একঃ

দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার,  আনুমানিক দুপুর ২ টা বাজবে। অন্তু ঘরে ই ছিল। সম্ভবত সাইকোলজি বইটি নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিল হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল।


দরজা খুলতেই ঘরে প্রবেশ করল একদল তরুনি! অন্তু এদের কাউকেই চিনে না, আর আগে কখনো দেখেও নি তাই অনেকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল " কাকে চাই"?

৫ জন মেয়ের মাঝে অপেকাকৃত খাট মেয়েটা বলল " ভাইয়া আমরা আপনার কাছে পড়তে চাই"........... এতোক্ষন অন্ত একটু বিচলিত ছিল,  পড়ার কথায় স্বাভাবিক হলো কেনোনা দিনের বেশি ভাগ সময় টা ওর টিউশন করেই কাটে।

অন্তু সবাই কে ভিতরে নিয়ে বসালো।  ৫ জনের মাঝে একটি মেয়ে ছিল একদম ই ব্যতিক্রম। অন্য যে কোন মেয়েদের চেয়ে একটু আলাদাই মনে হলো মেয়েটা কে ওর। মেয়েটা বোরকা পড়া ছিল, চোখে গাঢ় করে কাজল দেওয়া, মায়াবী চোখের চাহনিতে কেমন যেন বিব্রতবোধ করল অন্তু। সবাই কে বসতে বলে অন্তু ভিতর রুমে গেল ফ্রেস হতে। 


একটু পর যখন ও পুনরায় আসলো,  সবাই বসে আছে, সেই মেয়েটা দাড়িয়ে ছিল পাশে। অন্তু মনে মনে ভাবলো " যেই মোটা, না বসা ই ভাল, আমার খাট ভাংতে পারে"!! কিন্তু মুখে স্বাভাবিক একটা হাসি এনে বলল- সবাই বসছে,  তুমিও বসো?  মেয়েটা মুখে কোন কথা বলল না, চুপ করে বসে পড়ল। মেয়েটা,বসতেই খাট টা ক্রাক করে একটা শব্দ করে উঠেল, সাথে সাথে সবাই হেসে উঠল। 

অন্তু একে একে উদের নাম জিজ্ঞেস করতে লাগল। খাটো মেয়েটি একটু বেশি ই চঞ্চল।নাম নন্দিনি, হিন্দু। তারপর ফারজানা,জান্নাত,নিতু,রিতা........এভাবে যখন নন্দিনি পরিচয় করাতে করাতে সেই মেয়েটার দিকে ফিরল,  নন্দিনি কিছু বলার আগেই বলল-আমার নাম "জল"............

দুইঃ 

মেয়েগুলোকে প্রথমেই অন্তুর মনে হয়েছিল প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি ই চঞ্চল, আর একটু বেশি বেখেয়ালি, উগ্র স্বভাবের। ওর ধারনা ই ঠিক হলো। আজকে ও অন্য ২ দিনের মতো ই অন্তু পড়াচ্ছিল। অন্তু সারাধনত মেয়ে ছেলে আলাদা পড়ায় কিন্তু এই ব্যাচ টা একসাথে পড়াবে ঠিক করল। কিন্তু একসাথে পড়ানোর সমস্যা টা কিছুক্ষন পর ই ও টের পেলো.......জান্নাত হঠাৎ করেই বেকে বসলো পাশে বসা আহমেদ ছেলেটার সাথে। এক কথায়, দু কথায় সেটা রূপ নিলো ঝগড়ায়। অন্তুর জিবনে এতোটা অবাক ও কোন দিন ই হয় নি, কারন টা স্টুডেন্ট দের ঝগড়ার জন্যে নয়, কারন হচ্ছে ওর সামনাসামনি বসা জল মেয়েটা......অন্তু মেয়েদের ঝগড়া থামাতেই যাচ্ছিল কিন্তু ওর দিকে তাকিয়ে জল মেয়ে টা হঠাৎ করেই I love you বলে চিতকার করে উঠল!!

সবাই ঝগড়া থামিয়ে চুপসে গেলো,  একে অপরের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে..... অন্তু প্রথমে ভাবলো ভুল শুনেছে, তাই জিজ্ঞেস করল--এক্সকিউস মি? আমি যদি ভুল করে না থাকি আপনি কিছু একটা বলছেন??
জল কোন রকম দ্বিধাবোধ না করে পুনরায় বলল-- হ্যা বলেছি, Do you love me!! 

অন্তু এবার শুধু অবাক ই নয় সাথে সাথে বিরক্ত ও হলো। চেহারাতে বিরক্তি নিয়ে ই বলল-- 
এটা পড়ার জায়গা, প্রেমশালা নয় যে আপনি প্রেম নিবেদন করতে বসবেন! 

অন্তুর কথা জলের উপর তেমন কোন প্রভাব ফেলতে পেরেছিল বলে মনে হয় না কেননা জল বাকি সময়টা পড়ার দিকে মনোযোগী না হয়ে ফেল ফেল করে অন্তুর দিকে তাকিয়ে রইল। ব্যাপারটা অন্যদের চোখে যেমন তিক্ত লাগল, জলের ততোটাই ভাল লাগল। 

জান্নাত কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললঃ স্যার, আমরা এখানে পড়তে আসছি, কারো যদি প্রেম করার খায়েশ থাকে ওকে বলবেন আলাদা পড়তে, কথাটা বলেই ব্যাগ নিয়ে সোজা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো!  
কেউ কোন জবাব দেওয়ার আগেই জল বললঃ আশ্চর্য!!  আমি কি বলব না বলব তা কি ওর কাছে শিখতে হবে! আমি আমার মনের কথাটা বলছি, কার ভালো লাগলো  বা না লাগলো এটা দেখা আমার বিষয় নয়! 
অন্তু কি বলবে ভেবে পেলো না তাই সবাই কে উদ্দেশ্য করে বলল-- আগামীকাল থেকে ছেলে মেয়ে আলাদা পড়বেন, আর যার যার প্রেম করার ইচ্ছে আছে তারা দয়া করে আর,আমার বাসায় আসবেন না। কথা বলে অন্তু ভিতরে চলে গেলো। সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল,  শুধু জল মাথা নিচু করে গান গাইতে থাকলো.....